রবিবার, ৩১ আগস্ট, ২০১৪

মধ্যবিত্ত

আমরা যারা মধ্যবিত্ত তাদের জীবনটা অনেকটা শুককীট থেকে পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি হবার মতো। আমাদের ছোটবেলা কাটে রঙ তুলির আঁচড়ে স্বপ্ন বুনতে বুনতে। একটু বড় হলে বাবা মা ব্যাস্ত হয়ে যান শহরের নামকরা স্কুলগুলোতে ভর্তি করতে। সেই ছোটবেলা থেকেই আমরা বড় হতে শিখে যাই। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও অনেক সময় বিশাল অংকের ডোনেশনের জন্য ভাল স্কুলগুলোতে পড়া হয় না আমাদের। আমাদের বাবা মা এপ্রান্ত ওপ্রান্ত ঘোরাঘুরি করে, মন্ত্রী মিনিস্টারের হাতে পায়ে ধরেও সেই বিশাল অঙ্কের বোঝা কমাতে পারেন না। মন্ত্রী মিনিস্টাররা আমাদের কাজে আসেন না। আমাদের ভর্তি হতে হয় পাড়ার বেনামী কোন স্কুলে। তারপরও আমাদের দৌড় চলতে থাকে। স্কুলে ভাল রেজাল্ট করার দৌড়, দৌড়ে প্রথম হয়ে শখের বইটা জেতার দৌড়। কারণ, এতগুলো বই আমাদের বাবা মার কিনে দেবার সামর্থ্য নেই। তাই আমাদের দৌড়ে জিততে হয়। সবাইকে পেছনে ফেলে জিততে হয়। স্কুল পেড়িয়ে যখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছি সেখানেও দৌড়।আমাদের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি হতে হয় কারণ সেই একই। আমাদের বাবা মা সেই বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়ে আমাদের প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোতে পড়ানোর সামর্থ্য রাখেন না। আর যদিও বা আমরা কোন ভাবে সেই প্রাইভেট ভার্সিটিগুলোতে ঢুকে পড়ি , তখন আমাদের দিনের বেশির ভাগ সময় যায় ছাত্র পড়ানোর জন্য এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে। আর এদিকে উপবৃত্তির চাপ তো আছেই। সারাদিন ছাত্র পড়িয়ে যদি রেজাল্টটা খারাপ করে ফেলি; তবে এ বারের বৃত্তিটা গেল বলে। আমাদের সকালটা শুরু হয় পাবলিক বাসের ঠেসাঠেসিতে,ঘামের দুর্গন্ধময় সীটে যেখানে রোজকার দিন মুরগী ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে আলু পটলের দোকানিরা তাদের মাল নিয়ে যান।এর ভাল দিক বলতে এই যে, এদের আমরা মানুষ বলে চিনতে পারি।কোনদিন যদি প্রাইভেট কারে চড়েও বসি তখনও এই বাস টেম্পুতে ঝুলে যাওয়া মানুষগুলোকে মানুষই মনে হয়, পোকা মাকড় মনে হয় না। কারণ আমরাও একদিন তাদের দলে ছিলাম। আমাদের সঞ্চয় শুরু হয় সেই স্কুলের টিফিনের দু টাকা বাঁচিয়ে লেমন জুস কেনা থেকে।আমরা সেই ছোট বেলা থেকে স্বাবলম্বী হবার কথা ভাবি কারণ সেটাই আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ। আমাদের স্বপ্নের রোজ মৃত্যু হয় কিন্তু রোজ আমরা নতুন করে স্বপ্ন দেখি। আমাদের ছেলেদের পকেটে হাত খরচের টাকা যে টুকু বাঁচে তা দিয়ে আমরা সাথীকে সোনার চেইন দেওয়ার সাহস করি না, কিংবা বড় কোন রেস্তোরায়ও নিয়ে যাওয়ার সাহস করি না। তার জন্মদিনে হয়ত এক মুঠো গোলাপ অথবা একটা বই; এর বেশি দেবার সাধ্য আমাদের হয় না। কিন্তু সেই বিশেষ এক জনের জন্য বছরের একটা তারিখ মনে রাখা, টিউশনির মাস শেষের বেতন ভাঙিয়ে তার জন্য অতি কষ্টে কিছু একটা কেনার সুখ শুধু আমরাই বুঝি। আমাদের মেয়েরাও সেই একই ভাবে কোনদিন ঝুলতে ঝুলতে আবার কোনদিন ভিড়ের চাপে লোকজনের পায়ে চাপা খেয়ে রোজ ক্লাসে আসে। কোনদিন যদি কোন এক সহযাত্রী দয়াবশত তার সিটটা ছেড়ে বসতে দেন তখন তাকে ফেরেশতা বলে মনে হয়।আমাদের মেয়েরা খুব বেশি স্বপ্ন দেখে না, কারণ সে ভাল করেই জানে যে সে কোন রাজকুমারী নয়। বরং সে হয়তবা কোন পরিবারের একমাত্র সম্বল। পড়াশোনা শেষমাত্র সংসারের হালটা হয়ত তাকেই ধরতে হবে।কিন্তু তারপরও মধ্যবিত্তের কিছু সুখ আছে, কিছু অপ্রয়োজনীয় অহংকার আছে। যেমন আমরা সমাজের এমন এক অংশ যারা বিন্দু থেকে সিন্ধু রচনা করি।আমাদের ওঠাবসা সমাজের উচু থেকে নিম্নস্তর পর্যন্ত। তাই হঠাৎ উচুতে উঠে ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভয় নেই আমাদের।সম্পর্কের মূল্য আমরা বুঝি,কারণ শ্রান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর সহধর্মিণীর ওই হাসিটাই আমাদের ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।দ্বিতীয় কোন পুরুষ বা নারীর প্রয়োজন হয় না কারণ আমরা ছোট বেলা থেকেই যেটুকু আছে সেটুকু খড় কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে বাঁচতে শিখি। ছোট বেলা থেকেই সামাজিক রীতি নীতি আমাদের ভেতর এমন করে খোঁদাই করা হয়েছে যে এর বাইরে যেতে আমরা ভয় পাই। তাই রাতের বেলা ক্লাবিং এর থেকে ছাদের ওপর ঠাণ্ডা বাতাসই আমাদের কাছে বেশি আনন্দায়ক মনে হয়। আর তাই এই রীতি নীতি,আচার আচরণ যদি মধবিত্তের সস্তা অহংকার হয়, তবে নির্দ্বিধায় আমি অহংকারী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন