এবার মূল নিবন্ধে আসি; আমি পর্দা করা শুরু করি খুব সম্ভব ২০০৫ থেকে। ক্লাস সেভেনে পরি তখন। হিজাব শুরু করাটা একটু ইন্টারেস্টিং কারণ ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল হঠাৎ করে ভেতর থেকে। ইংলিশে যেটাকে বলে Realization. আমি নামাজ পরি মোটামুটি ছোটবেলা থেকেই ; যখন থেকে একজন মানুষের সাথে স্রষ্টার পরিচয় হয় মোটামুটি তখন থেকেই। নামাজ পরার শুরুটা আসলেই খুব মজার ছিল কারণ প্রথমত আমি খুবই আগ্রহ নিয়ে পরতাম। দ্বিতীয়ত; এটা আমার বড় হবার প্রথম ধাপ। কারণ বড়রা যা করে আমি ঠিক সেই কাজটাই করছি। বলা যায় ছোট বেলায় খুব উৎসাহ নিয়ে নামাজ পরতাম। আম্মু বলত তুমি নামাজে যা চাবে আল্লাহ তোমাকে তাই দেবেন। এক কথায় "ইচ্ছে পূরণ"- ছোট্টবেলার জীবনে এর থেকে আনন্দের কিছু ছিল না। মনে আছে একবার মাগরিবের নামাজে আল্লাহর কাছে একটা আপেল চাইলাম। অনেকক্ষণ ধরে কেবল একটা আপেলের জন্যই প্রার্থনা করলাম। হঠাৎ কলিংবেল বাজল - দেখি; বাবা অফিস শেষে আসলেন আর বাবার হাতে আপেলের প্যাকেট। চার পাঁচ বছরের বাচ্চার কাছে এর থেকে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে। স্রষ্টার সাথে তাই আমার ছোট্ট বেলার সম্পর্ক সত্যিই খুব সুখকর ছিল। যাই হোক বোরখার শুরুটা অনেকটা এমন ছিল যে -একদিন আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম পাশ্চাত্য জামা কাপড়ের চেয়ে হিজাবে আমাকে যথেষ্ট বেশি মানায় আর সব থেকে বেশি ভাল লাগে। সেই সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টিও অর্জন হয়। আসলে হিজাব পরার পেছনে আমার মায়েরও অবদান ছিল। কারণ আমার মাও পর্দা করেন। ২০০৮ এ শুরু করলাম বোরখা। এর ভেতর খুব যে হিজাব পরেছি এটা বলব না বরং অধিকাংশ সময়ই পরিনি। বোরখা শুরু করার কারণটা একদিকে ছিল আমি প্রচণ্ড রকম ধার্মিক হয়ে গিয়েছিলাম এবং একই সাথে আমার বিশ্বাস ছিল বোরখা নারীকে একরকম রক্ষাও করে। আর মজার ব্যাপার ছিল you can wear anything underneath.
বোরখা আমি পরি ২০১২ সাল পর্যন্ত।আমার একটাই বোরখা ছিল। একটা বোরখার কারণ ছিল দুইটা বোরখা যে লাগতে পারে সেই চিন্তা আমার মাথায় না আসা। আর আমি ওই চারটি বছর দারুন রকম simplicity তে বিশ্বাসী ছিলাম। অনেকটা sainthood টাইপ। ২০১২ সালের পর পরিবর্তনটা আসে কারণ আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে দিনের পর দিন একই আমিকে দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই ঠিক করি বোরখার বদলে হিজাব নেওয়ার। তাই আমার চার বছরের গোলাপি বোরখার স্থান হোল ষ্টোর রুমে। তারপর আসলো রংবেরঙের হিজাব। তখনও হিজাব পরা আজকাল কার দিনের মত বোধ হয় অহরহ ছিল না। বছর গড়াতে না গড়াতেই দেখলাম আশেপাশের অনেকেই হিজাব পরে। খুবই ভালোকথা।
অতঃপর আসলো ২০১৩ সাল। হিজাব এখন বাংলাদেশে মোটামুটি একটা ফ্যাশন আইটেম। যারা হিজাব পরে অথবা হিজাব কে শ্রদ্ধা করে তারা যেন মনে না করে আমি হিজাবকে ছোট করছি। আমি বলছি হিজাব হাউজগুলোর কথা যেগুলো নানা ফ্যাশনের বা নানা ডিজাইনের হিজাব তৈরি এবং বিক্রয় করে। দুনিয়ার মানুষ ফ্যাশনে এগিয়ে যাচ্ছে হিজাবিদেরও অবশ্যই পিছিয়ে থাকা উচিত না। ব্যাপারটা ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমার এমনি মনে হত।
এখন আমার কথায় আসি। ২০১৩-২০১৪ সাল আমার জীবনের স্মরণীয় দুটি সাল। মনে হয় এই দুটি বছর জীবনে না আসলে জীবনের অনেক কিছু অচেনাই থেকে যেত। ২০১৩ সালে আমি প্রথম এ প্রশ্নের সম্মুখীন হই যে কি করে একজন স্বল্পবসনা নারী পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং রোজাদার হতে পারে। আমি আদৌ জানি না দাবীটুকু কত আংশিক সঠিক। তবু আমি এখন এত টুকু জানি এটা সম্ভব। কারণটা খুব সোজা ; একজন মানুষকে কখনো কেবল মাত্র একটা দিক থেকে বিচার করা যায় না। আর সব থেকে বড় ভুল আমি করছিলাম মানুষটিকে বিচার করে। "Being a good girl and being a good person is not actually the same thing"
অতঃপর দ্বিতীয় প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম যখন আপাতদৃষ্টিতে হিজাব পরিহিত এবং নামাজ-রোজা কায়েমকারী এক মহিলাকে আপন পুত্র সন্তান কিংবা আপন স্বামীর প্রত্যক্ষ ব্যভিচারকে সমর্থন করতে দেখলাম। তার মানে দাড়ায় - All that glitters are not gold.
এখন আমার কথায় আসি; আমি যতটুকু জানি ইসলাম খুব সাধাসিধে জীবনকে সমর্থন করে ।এর ঐশ্বর্য এর সরলতায় । সেখানে বিত্ত বৈভব কিংবা প্রাচুর্যের রাশ ভার নেই; অহমিকা নেই; সব থেকে দামি রেস্তোরাঁয় খাওয়ার মত গাম্ভীর্যতাও নেই। এক কথায় সব থেকে সুন্দর জীবনাভিধান।
এখন বর্তমানের কথায় আসি; ফুডব্যাংক! নাই বললাম। বিশ্বাস করুন আমি একটু আগে বিখ্যাত মোস্তাকিমের চাপ থেকে ইফতারি করে আসলাম। দুই রাকাত নামাজ কাজা গেল। ইচ্ছে ছিল ইশারায় নামাজ পরে নেব। কিন্তু শুনলাম পর পুরুষের উপস্থিতিতে নামাজ হয় না। পর পুরুষের সাথে রোজা খোলা যেতে পারে কিন্তু নামাজ হবে না। এতটা কঠিন ইসলাম সেটা আগে জানতাম না।
আমাদের কয়েকজন সহপাঠী আছেন যারা খুব সুন্দর পর্দা করেন। বিশ্বাস করুন দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। একজন মানুষ যে আল্লাহকে ভালবেসে এত সুন্দর ভাবে নিজেকে আবৃত করতে পারে নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। বলে রাখা ভাল আমি পর্দাকে সম্মান করি। কিন্তু পর্দার মূল আদর্শ যেখানে সরলতা সেখানে চোখ ধাঁধানো জরি চুমকির বাহার কত টুকু আদর্শকে ধরে রাখে সেটা আল্লাহই বলতে পারেন।
পরিশেষে আমার কথা; আমার নিবন্ধের প্রথম অংশ পরতে কারো ভাল লেগেছে কিনা জানা নেই; কিন্তু আমার আসলে ভাল লাগে নাই । ভাল লাগে নাই এ কারণে যে আমি কোন সালে কি পরিধান করেছি কি করি নাই এটা পাবলিকের বিষয় হতে পারে না। তেমনি আজ আমি কি পরছি কি পরছি না সেটাও আসলে পাবলিকের বিষয় না। যারা আমার বন্ধু যারা আমার ভাল চায় তাদের সৎ কৌতুহলকে আমি সমর্থন করি। কিন্তু আমি মনে করি না মাথার উপর তিন হাত লম্বা কাপড় আমার সমগ্র পরিচয় বহন করে। Let me find my own light.
আর বিচারের মালিক তো তিনি একজনই তাই না? তাই যার দায়িত্ব তার উপর ছেড়ে দেয়াই বোধ হয় মঙ্গল। বরং অন্যকে বিচার করতে গিয়ে যেন গীবত আর পরনিন্দার চর্চাটাও আমরা করে না ফেলি; এই ভাবনাটাও বোধ হয় থাকা দরকার আমাদের মাঝে। আমার কেন জানি মনে হয়; নিয়মের ভেতর থাকতে গিয়ে কখনো কখনো আমরা নিয়মের বাইরেই চলে যাই। নিয়ম অনিয়মের বিচারের থেকে বোধ হয় ভ্রাতৃত্ববোধটা বেশি জরুরী। আর যাই হোক; ইসলাম শব্দটি এসেছে استسلاما শব্দ থেকে; যার سلام শব্দটির অর্থ "শান্তি" ।