বৃহস্পতিবার, ২৪ জুলাই, ২০১৪

একদা প্রেম...

"আমি একদিন প্রেমে পরলাম । ভীষণ রকম প্রেমে পরলাম । সত্যি বলতে এই প্রেম থেকে উঠার কোন ধরনের ইচ্ছাও আমার ছিল না। অনেকটা রূপে গুনে মুগ্ধ হয়ে প্রেমে পড়া না। প্রেমে পরব না বলতে বলতে হঠাৎ আবিষ্কার করা যে আমি আসলে প্রেমে পরে গিয়েছি। ডাঙ্গাতে মাছের যে অবস্থা হয় আমার প্রানের অবস্থা টাও সেই এক ই হলো। আর নিজেকে মনে হতে লাগলো অমবশ্যার চাঁদের মত। যে কিনা নিজের উপস্থিতি নিয়েই লজ্জিত।

বালিকা কাল থেকেই প্রেম নিয়ে আমার মনে চরম শঙ্কা আর উদ্বেগ কাজ করত। পৃথিবীতে জীবন ধারনের জন্য এত বিষয় থাকতেও মানুষ যে কেন প্রেমে পরে সেই বিষয়টা নিয়ে আমি যারপরনাই চিন্তিত ছিলাম। প্রেমে পরার অনাবশ্যকতা এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ সম্পর্কে সুযোগ পেলেই জ্ঞান দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করতাম।সে কথা নাহয় এখন থাক।আমি আমার প্রেমের কথায় আসি। হুম, একদা এই আমি প্রেমে পরলাম । এখানে কার প্রেমে পড়েছি সেটা জরুরী না। তবুও যেহেতু আমার 'তার' প্রসঙ্গ এখানে আসছে, এটা বলে রাখা যায় যে- আমি অতন্ত বদ একটা ছেলের প্রেমে পরলাম ।

যে বস্তু বিশ্বাস করি না সেই বস্তুটি প্রতি মুহূর্ত লালন করা কষ্টদায়ক। কিন্তু তারপরও আমি প্রেমে পরলাম ।

নানা জনের নানা মত নিলাম, পর্যবেক্ষণ করলাম। অনেকটা নিজের প্রেম কে এইচ এস সির জীববিজ্ঞান এর অসহায় ব্যাঙ টার মত কাটাকুটি করলাম। কিন্তু সব কিছুর শেষে এই সিধান্তে আসলাম যে আমি আসলেই প্রেমে পরেছি । কিন্তু আমি প্রেমে পরলে পাবলিকের কি আসে যায়? না আসলেই কিছু আসে যায় না। একটি বালিকা তার জীবনের কোন না কোন সময় প্রেমে পরবে এটা খুবই স্বাভাবিক।তা এত ঘটা করে বলার কি আছে?

না আমি আসলে আমার প্রেমের গল্প বলতেও এই লেখাটা লিখি নাই। আমি যার প্রেমে পরেছি সে আমার প্রেমিক ও না। আমিও তার প্রেমিকা কিনা সন্দেহ। ছোট বেলা থেকেই আমি অনুভুতি নিয়ে খেলতে ভালবাসি। আমি আমার অনুভুতির কথাই বলব। পরিসংখ্যান বলে এ আমার প্রথম প্রেম। প্রথম প্রেম বললাম এ কারণে যে আমি এক এবং একমাত্র প্রেমে বিশ্বাস করি না। মানুষ ভালবাসবে, কষ্ট পাবে ।আমি বিশ্বাস করি বিধাতা মানুষ কে অনেক বড় হৃদয় দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন । তার সৃষ্টির efficiency এত কম হতে পারে না । তবুও আমরা কারণে অকারণে বিশেষ কিছু মানুষের প্রেমে পরি ,কেন পড়ি এটা হয়ত বিধাতার কোন রহস্য।

সুতরাং আমি অনেকটা নোঙ্গর হীন জাহাজের মত প্রেমে পরলাম।আমার কাছে প্রেমে পরাটা অনেকটা অ্যালার্ম দেওয়া নষ্ট ঘড়ির মত । যেটা সময় অসময়ে এবং অনেকটা নিয়মিত ভাবে আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি প্রেমে পরেছি । মাঝে মাঝে মনে হয় এখানে মানুষটা মুখ্য না, প্রেম টাই মুখ্য । অর্থাৎ আমি প্রেমে পরেছি এবং একজন মানুষের প্রেমে পরেছি। নতুন প্রেমের অভিজ্ঞতা বলতে এটুকু বলা যায় যে আমি এখন একটা আংশিক তরল এবং গ্যাসীয় অবস্থার মধ্যে বিরাজমান । অর্থাৎ আমার ভুবনের অনেকটাই কাল্পনিক । আর খুব কম অংশই বাস্তব।

এতকিছুর পরও আমি প্রেমে পরলাম। প্রেম যেহেতু মনের ব্যাপার আর মন যেহেতু দেখা যায় না। সেহেতু এক রাশ লাল গোলাপ নিয়ে প্রেম নিবেদন বা বিতরনের পক্ষপাতি আমি নই। সোরগোল করে বলার মতন ও নয়। তারপরও কেন বললাম? হ্যাঁ যে মানুষটার প্রেমে পরেছি হয়ত তার জন্যই বললাম। তাকে তো র কানে কানে গিয়ে বলে আসা সম্ভব না, কিংবা এই পোস্ট এর মাধ্যমে তাকে জানাবো ??? - এতটা খারাপ performer আমি নই। সুতরাং প্রেম হৃদয়েই থাক।

আমার এত বড় প্যাঁচালের সারমর্ম এই যে, ভালোবাসা জিনিসটা আসলেই ভয়ানক। কিন্তু কাউকে ভালবাসায় আসলে অনেক আনন্দ আছে।তবে সেটা প্রেম হতে হবে তা জরুরী না। মাঝে মাঝে জানতে ইচ্ছা করে,আমি যে মানুষটাকে ভালবাসি সে যদি জীবনের কোন এক সময় জানতে পারে তার অগোচরে একটা মানুষ তাকে ভালবেসে ছিল, তখন তার কি অনুভুতি হবে? আমি জানি অনুভুতি টা খুব একটা গাঢ় হবে না। এ অনুভুতি প্রগাঢ় হবে তখনই যখন সেই এক ই মানুষ কাউকে ভালবাসবে, মাঝে মাঝে মানুষটাকে খুব হিংসা হয়। কেমন দুর্দান্তও প্রতাপে একজন মানুষের চিন্তার জায়গাটুকু আছন্ন করে নিল। খুব হিংসা হয়। ইচ্ছা করে দৌড়ে গিয়ে বলি "ওই বেটা রাজত্ব ছাড় , নয়তো ওই রাজত্বের কিছুটা অংশ আমাকে দে "।
পরিশেষে, ভালোবাসা গুলো ভালো থাকুক। আর ভালোবাসার মানুষ গুলো ভালো থাকুক।যারা ভালোবাসে তাঁরাও ভালো থাকুক ।আল্লাহ যেন সবাই কে ভালো রাখেন । মা ভালো থাকুক। বাবা ভালো থাকুক।লক্ষ্মী ভাইটা আর আদুরে বোনটাও ভালো থাকুক। পাশের বাড়ীর মেয়েটাও ভালো থাকুক। আর "সে " ভালো থাকুক।

বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট, ২০১৩

বাবা

কিছু টুকরো  সাংসারিক হিসেবে ভরা ডায়রির পাতাগুলো । কয়েকটা পাতার ফাকে ফাকে দুই একটা কবিতা । বেশির ভাগ কবিতাই রাজনীতি আর সমাজ সংসার নিয়ে । কিছু কিছু কবিতা অবশ্য প্রকৃতি নিয়ে । পুরনো বই পত্রের স্তূপ হাতড়াতে হাতড়াতে হঠাৎ পাওয়া ডায়রিটা নিতান্ত কৌতূহল বশতই খুলেছিলাম । হিসেব গুলো ঠিক তারিখ মেলানো । কাচাবাজারের হিসেব থেকে শুরু করে সংসারের অতি ক্ষুদ্র ব্যয়টাও বাদ যায় নি । বোঝা গেল এই হিসেব রক্ষকের কাছে সংসারের অতি ক্ষুদ্র ব্যয়টিও অতীব মূল্যবান। পাতাগুলো উলটাতে উল্টাতেই একটা লেখা চোখে পড়ল, বিশেষত তারিখটার জন্যই চোখে পড়ল-

৯ ই ফেব্রুয়ারী , ১৯৯৪;

  " আজ আমাদের সংসারে নতুন অতিথির আগমন। বিকাল পাঁচ ঘটিকায় আমার স্ত্রী কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন। মা এবং সন্তান দুজনেই     আল্লাহর অশেষ রহমতে সুস্থ আছে । আমার ক্ষুদ্র আয়ের সংসার । স্ত্রী কে কখনও শখের কিছু দিতে পারি নি । আমি এবং সে সহ আমাদের সংসারে এখন মানুষ সংখ্যা বেড়ে ছয় জন। মাত্র তিন হাজার টাকা মাসিক আয়ে সংসার চালান দিন দিন কষ্ট সাধ্য হয়ে উঠছে ।"

লেখাটা পরে মনটা কেন জানি খারাপ হয়ে গেল। ডায়রিটা রেখে দিলাম। সব ধরনের কষ্টের কথা শুনতে আমরা অভ্যস্ত নই।

বেশ কিছুদিন আগে। ঘর ঝাড়তে গিয়ে কোথা থেকে এক টুকরো কাগজ পেলাম। জরুরি কাগজ ভেবে তূলে নিলাম। একটা চিঠি -

"

২১।০৬।১২ ইং

দোস্ত

      আসসালামু আলায়কুম। ইচ্ছে হল তোকে ফোন করি । ব্যাল্যান্স কম । বেশি কথা বলা যাবে না। এখন রাত ৯টা । কি করছ জানি না। আমি আমার বেড রুমে  বসে লিখছি । এ মুহূর্তে তোমার ভাবী ড্রইং  রুমে বসে স্টার জলসায় মা ধারাবাহিক দেখছে। ছোট মেয়েটার আজ ১ম সেমিস্টার শেষ হল। মেয়েটা কদিনের জন্য একটু relax করবে। তাই ওর মার সাথেই আছে ।

    বেশ কিছুদিন ধরেই তোকে চিঠি লিখতে ইচ্ছে করছে। আজ একুশ জুন , হয়ত এ চিঠি পৌছাতে পৌছাতে  জুন শেষ হবে। এর মাঝে বহুবার কথা হবে । বহু ঘটনা ঘটবে । দিন ঘণ্টা কাল পেরোবে ।

   কালে কালে আমাদের বহু কাল পেরোল । সেই কবে কৈশোরে আমাদের দেখা , পরিচয়, পড়াশোনা, সময় কাটানো , কত ঘটনা, কমলাকান্তের পাড়ে পাড়ে রামনাবাদ নদীর ঢেউ গোনা । কত ছবি, যাত্রা পালা লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা ।

  এক পর্যায়ে পড়াশোনা শুরু না হতেই শেষ হয়ে এল আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবন । কিন্তু আরথিক টানাপোড়ন আমাদের বৈষয়িক শিক্ষা কে বন্ধ করতে পারল না । তুমি বাবার বড় সন্তান বলে বাবার দায়িত্ব ভাগ করে নিলে । আর আমি বঞ্ছিত হলাম শিক্ষার পথ আর সুখের রথ থেকে।আমি ছিন্ন পাতার মত উড়লাম যেদিকে হাওয়া যায় সেদিকে। কিংবা নোঙ্গর হীন তরীর মত।

আমি শেকড় হীন গাছের মত ঝরে পড়ে পদদলিত হতে লাগলাম । জানার অদম্য বাসনা পড়ে পড়ে মার খেল । আর রাজনীতির বাতাস আমার গায়ে লাগলো ।


গণতান্ত্রিক স্বাধিকার আর স্বাধীনতা আন্দোলন এসব ই আমাকে কাজ করিয়ে নিল । সাথী হলাম যুদ্ধ যাত্রার ।কত পথ কত গ্রাম মাড়িয়েছি খেয়ে না খেয়ে । হাটে মাঠে মানুষকে পশ্চিমাদের সীমাহীন বৈষম্যের কথা ।আমারা চেয়েছি মুক্তি ।

তারপর আবার পথে পথে ঘুরেছি । সংসার কি না বুঝতেই সংসারী হয়েছি । সীমাহীন যুদ্ধের সাথী করেছি আর এক জনকে । "


চিঠিটা যত্ন করে টেবিলে রেখে দিলাম।

মাঝে মাঝে কেনও জানি এই পত্র লেখকের জন্য খুব মায়া হয়। তার ডায়রির পাতায় পাতায় আমি মাত্র আড়াই মাস বয়সে মা হারা এক কিশোর কে দেখতে পাই। সংসারের বৈঠা হাতে নিয়ে উত্তাল সাগরে তরী ভাসানো এক সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুন কে দেখতে পাই।বড় মায়া হয় তার জন্য। ডায়রির পাতায় হঠাৎ হঠাৎ কাঠ কয়লার লালচে আগুনের আচে  এক কিশোরী বধুর নিষ্পাপ মুখ খানি ভেসে ওঠে । দুজন মিলে কি অক্লান্ত পরিশ্রমে তরীটাকে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা।

পত্র লেখকের কিছু কিছু লেখা অনেকটা আকস্মিক ভাবেই আমার হাতে চলে আসে । কখনও বা  আমার রাফ খাতার অব্যবহৃত পেজ এ কিংবা ঘরে পড়ে থাকা টুকরো কাগজের ভেতর। সংসারের যাঁতাকলে পরে  তার আজন্ম লালিত সপ্ন গুলো হয়ত অনেক আগেই ফিকে হয়ে গেছে ।তবু ভাবতে ভালো লাগে যে তিনি সপ্ন দেখেন।হয়ত সেই স্বপ্ন আমাদের স্বপ্নের মত স্বার্থপর হয়ে জন্মভুমি ত্যাগ করে বিদেশ ভূমে পাড়ি জমানোর কথা ভাবে না। দেশের মাটিতে ছোট্ট একটা নীড়ের কথায় ভাবে। শুনলাম মানুষটি নাকি এখন তার গ্রামের বাড়িতে ছোট্ট একটা বাড়ি বানাতে ভীষণ ব্যস্ত ।
গ্রাম তার খুব প্রিয়। বাকিটা জীবন তিনি গ্রাম এ কাটাবেন এই হচ্ছে তারভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ।  .তার এই ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ঠিক কতটুকু কাজ করবে টা যদিও এই লেখকের উপর বর্তায় । তবুও বলব , পরিকল্পনা অসাধারন তবে যুক্তি গ্রাহ্য নয়। কেনও নয় তা এ গল্পের বিষয়বস্তু না।তাই ওই ধারায় নাই গেলাম।


পরিশেষে , মাঝে মাঝে জীবনটাকে অনেক অপ্রয়োজনীয় মনে হয়। বেচে থাকার মানে যখন খুব সীমিত হয়ে আসে। ব্যর্থতা আর কষ্ট গুলো যখন যুক্তির বাধা মানতে চায় না। তখন এ নাবিকের কথা বেশ মনে পড়ে। হয়তবা আমাদের জীবনে কষ্ট গুলো খুব সস্তা। সুখগুলোই দামী। আমরা তাই সুখ দাম দিয়ে কিনতে চাই । আঙুলের ফাক দিয়ে ছোট ছোট সুখ গুলো যে কখন বেরিয়ে যায় , আমাদের তা চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে এ মানুষটির মত স্বপ্ন দেখতে ইচ্ছা করে। ছোট খাটো স্বপ্ন। এ মানুষটির মত করে কিছু মানুষের জন্য বেচে থাকতে খুব ইচ্ছা করে ।


বাবা  তোমার সত্যিকারে মা হতে খুব ইচ্ছা করে। তোমার মায়ের মত করে বলতে ইচ্ছা করে "অনেক বড় হও বাবা দীর্ঘজীবী হও।"